শবে মেরাজ: বাংলাদেশে আধ্যাত্মিক জাগরণ ও মহিমান্বিত রজনীর পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
শবে মেরাজ বা লাইলাতুল মেরাজ ইসলাম ধর্মে এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ ও অলৌকিক ঘটনার স্মারক। "শবে মেরাজ" শব্দটি ফারসি ও আরবি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত, যেখানে 'শব' মানে রাত এবং 'মেরাজ' মানে ঊর্ধ্বগমন। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজের কাছে এই রাতটি অত্যন্ত পবিত্র এবং ইবাদত-বন্দেগির জন্য বিশেষ গুরুত্ববহ। এটি মূলত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাস হয়ে সপ্ত আসমান পাড়ি দিয়ে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক অবিস্মরণীয় যাত্রার কাহিনী।
বাংলাদেশে শবে মেরাজ কেবল একটি ধর্মীয় অনুশাসন নয়, বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের প্রতি বিশ্বাস পুনরুজ্জীবিত করার একটি মাধ্যম। প্রতি বছর হিজরি সনের রজব মাসের ২৭ তারিখ দিবাগত রাতে বাংলাদেশে এই দিবসটি যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হয়। এই রাতে দেশের প্রতিটি মসজিদে ঢল নামে মুসল্লিদের, ঘরে ঘরে চলে নফল ইবাদত এবং কোরআন তিলাওয়াত। এটি এমন এক রজনী যা মুসলমানদের ইসলামের মূল স্তম্ভ ‘নামাজ’-এর উপহার পাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
মেরাজের এই অলৌকিক ঘটনাটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত: 'ইসরা' এবং 'মেরাজ'। ইসরা হলো মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমের মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ, আর মেরাজ হলো সেখান থেকে ঊর্ধ্বলোকে গমন। বাংলাদেশের মুসলিম সংস্কৃতিতে এই রাতটি অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে উদযাপিত হয়, যা সমাজের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ এবং ত্যাগের মহিমা ছড়িয়ে দেয়।
2026 সালে শবে মেরাজ কবে?
ইসলামিক চন্দ্র ক্যালেন্ডারের ওপর ভিত্তি করে শবে মেরাজের তারিখ নির্ধারিত হয়। চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে প্রতি বছর এই তারিখটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশে আগামী ২০২৬ সালের শবে মেরাজ পালিত হবে নিচের সময়সূচী অনুযায়ী:
তারিখ: January 16, 2026
বার: Friday
অবশিষ্ট সময়: আর মাত্র 13 দিন বাকি।
উল্লেখ্য যে, শবে মেরাজের তারিখটি চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এটি একটি পরিবর্তনশীল তারিখ। সাধারণত বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি রজব মাসের চাঁদ দেখার ঘোষণা দেওয়ার পর এই তারিখটি নিশ্চিত করা হয়। তবে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং বর্তমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি দিবাগত রাতেই এই পবিত্র দিবসটি পালিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শবে মেরাজের ইতিহাস ও পটভূমি
মেরাজের ইতিহাস ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান মোড়। নবুয়তের দশম বছর, যা ইতিহাসে 'আমুল হুজন' বা 'দুঃখের বছর' হিসেবে পরিচিত, সেই সময় মহানবী (সা.) তাঁর প্রিয় স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.) এবং পরম শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালিবকে হারান। এই কঠিন সময়ে যখন কাফেরদের অত্যাচার চরমে পৌঁছেছিল, তখন মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবকে সান্ত্বনা দিতে এবং নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে মেরাজে আমন্ত্রণ জানান।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) একটি স্বর্গীয় বাহন 'বোরাক'-এ করে নবীজিকে (সা.) নিয়ে প্রথমে জেরুজালেমে যান। সেখানে তিনি পূর্ববর্তী সকল নবীদের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি সপ্ত আসমান ভ্রমণ করেন, যেখানে আদম (আ.), ঈসা (আ.), ইয়াহইয়া (আ.), ইউসুফ (আ.), ইদ্রিস (আ.), হারুন (আ.), মুসা (আ.) এবং ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। পরিশেষে তিনি সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করে মহান আল্লাহর আরশে আজিমের কাছে পৌঁছান। এই সফরেই উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়।
বাংলাদেশের আলেম-ওলামারা এই ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বয়ান করেন, যাতে সাধারণ মানুষ মেরাজের শিক্ষা—অর্থাৎ আল্লাহর একত্ববাদ এবং নামাজের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে।
বাংলাদেশে পালনের রীতি ও ঐতিহ্য
বাংলাদেশে শবে মেরাজ পালনের ধরণ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিক। যদিও এটি কোনো উৎসব নয়, তবুও মানুষের মধ্যে এক ধরণের পবিত্র আমেজ কাজ করে।
১. মসজিদে বিশেষ প্রার্থনা:
শবে মেরাজের রাতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি মসজিদে বিশেষ বয়ান ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। এশার নামাজের পর ইমাম সাহেবরা মেরাজের বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করেন। অনেক মসজিদে সারা রাত ব্যাপী ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
২. নফল ইবাদত ও কোরআন তিলাওয়াত:
ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষ এই রাতে নফল নামাজ (সালাতুত তাসবিহসহ অন্যান্য নফল নামাজ) আদায় করে। অনেকে সারা রাত জেগে কোরআন তিলাওয়াত করেন এবং জিকির-আসকারে মগ্ন থাকেন। বাংলাদেশের মায়েরা ও বয়োজ্যেষ্ঠরা বাড়িতে তসবিহ পাঠ করেন এবং পরিবারের কল্যানের জন্য দোয়া করেন।
৩. আলোকসজ্জা:
যদিও এটি বাধ্যতামূলক নয়, তবুও অনেক মসজিদে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শবে মেরাজ উপলক্ষে আলোকসজ্জা করা হয়। বিশেষ করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ বড় বড় ধর্মীয় স্থাপনাগুলো সুন্দরভাবে সাজানো হয়, যা এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে।
৪. খাবার বিতরণ ও দান-সদকা:
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে যেকোনো বড় ধর্মীয় রাতে শিরনি বা তবারক বিতরণের একটি প্রথা রয়েছে। হালুয়া, রুটি, বিরিয়ানি বা খিচুড়ি রান্না করে প্রতিবেশী এবং গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। অনেকে এই দিনে নফল রোজা রাখেন এবং ইফতারের সময় অন্যদের আপ্যায়ন করেন।
৫. পারিবারিক মিলনমেলা:
শহর অঞ্চলে ব্যস্ততার কারণে অনেকে সময় না পেলেও, শবে মেরাজের রাতে পরিবারের সদস্যরা একসাথে বসে ধর্মীয় আলোচনা করেন। বড়রা ছোটদের মেরাজের গল্প শোনান, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখছে।
পর্যটক এবং প্রবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য
আপনি যদি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে অবস্থান করেন, তবে শবে মেরাজের পরিবেশ দেখার অভিজ্ঞতা হবে অনন্য। পর্যটক ও প্রবাসীদের জন্য কিছু বিশেষ পরামর্শ নিচে দেওয়া হলো:
পোশাক-আশাক: এই দিনে বাংলাদেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় থাকে। তাই আপনি যদি কোনো মসজিদ পরিদর্শনে যেতে চান বা জনসমাগমস্থলে থাকেন, তবে মার্জিত ও শালীন পোশাক পরিধান করা বাঞ্ছনীয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে পাঞ্জাবি বা টুপি এবং নারীদের ক্ষেত্রে মাথা ঢেকে রাখা স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মসজিদে প্রবেশ: অমুসলিম পর্যটকরা মসজিদের বাইরে থেকে আলোকসজ্জা উপভোগ করতে পারেন। তবে নামাজের সময় মসজিদের ভেতরে প্রবেশ না করাই ভালো। যদি ভেতরে যেতে চান, তবে অবশ্যই জুতো খুলে প্রবেশ করতে হবে এবং নীরবতা বজায় রাখতে হবে।
আবহাওয়া: জানুয়ারি মাস বাংলাদেশে শীতকাল। ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি আবহাওয়া বেশ শীতল ও শুষ্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে (তাপমাত্রা সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে)। তাই রাতে বাইরে বের হলে গরম কাপড় সাথে রাখা জরুরি।
যানজট ও পরিবেশ: বড় বড় মসজিদের আশেপাশে ভিড় বেশি হতে পারে। তবে রাস্তাঘাটে কোনো মিছিল বা উৎসবমুখর শোরগোল থাকে না, পরিবেশ থাকে অত্যন্ত শান্ত এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ।
খাদ্য: এই রাতে স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলো খোলা থাকে, তবে অনেক জায়গায় বিশেষ ইসলামিক খাবার বা মিষ্টির প্রাপ্যতা বেড়ে যায়। আপনি যদি স্থানীয় কোনো বাড়িতে আমন্ত্রিত হন, তবে ঐতিহ্যবাহী হালুয়া-রুটি চেখে দেখতে ভুলবেন না।
শবে মেরাজের শিক্ষা ও তাৎপর্য
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শবে মেরাজ কেবল একটি রাত নয়, এটি মুমিনের জীবনের পাথেয়। এই রাতের প্রধান শিক্ষা হলো 'নামাজ'। নবীজি (সা.) বলেছিলেন, "নামাজ মুমিনের মেরাজ।" তাই এই দিনে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা হয়। এছাড়া ধৈর্য, প্রতিকূল সময়ে আল্লাহর ওপর ভরসা এবং সৃষ্টি জগতের রহস্য নিয়ে চিন্তা করার তাগিদ দেয় এই মেরাজ।
বাংলাদেশে এই দিনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও লক্ষ্য করা যায়। যদিও এটি একটি মুসলিম প্রধান উৎসব, তবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও মুসলমানদের এই পবিত্র রজনীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। এটি সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
এটি কি সরকারি ছুটির দিন?
বাংলাদেশে শবে মেরাজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিবস হলেও এটি সাধারণ সরকারি ছুটি (Public Holiday) নয়। সরকারি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি একটি 'ঐচ্ছিক ছুটি' হিসেবে গণ্য হতে পারে।
অফিস ও ব্যাংক: সরকারি অফিস, আদালত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকসমূহ নিয়মিত সময়সূচী অনুযায়ী খোলা থাকে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: অধিকাংশ স্কুল-কলেজ খোলা থাকে, তবে কিছু মাদরাসা বা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই উপলক্ষে বন্ধ থাকতে পারে অথবা হাফ-স্কুল পালন করতে পারে।
ব্যবসা-বাণিজ্য: দোকানপাট, শপিং মল এবং বাজার স্বাভাবিকভাবে খোলা থাকে। তবে সন্ধ্যার পর থেকে মানুষ ইবাদতে মশগুল হওয়ার কারণে অনেক ছোট দোকান তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
পরিবহন: যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক থাকে, তবে সন্ধ্যার পর মসজিদের আশেপাশে অতিরিক্ত ট্রাফিক জ্যাম হতে পারে।
সংক্ষেপে, শবে মেরাজ বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এটি আত্মার প্রশান্তি এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ২০২৬ সালের January 16, 2026 তারিখে যখন সারা বাংলাদেশ এই মহিমান্বিত রাতটি উদযাপন করবে, তখন আপনিও এর আধ্যাত্মিক আবহ অনুভব করতে পারবেন। এই রজনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের সীমাবদ্ধতা থাকলেও মহান আল্লাহর ক্ষমতা অসীম এবং তাঁর রহমতের দরজা সবসময় খোলা।